জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে বাংলাদেশ: সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
- আপডেট সময় : ০৭:১৪:০৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬
- / 125

জলবায়ু পরিবর্তন বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বড় পরিবেশগত সংকটে পরিণত হয়েছে। এর প্রভাব বাস্তুতন্ত্র, অর্থনীতি, কৃষি, জনস্বাস্থ্য এবং মানুষের জীবনযাত্রায় গভীরভাবে পড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বৈশ্বিক গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান ০.৫ শতাংশেরও কম হলেও দেশের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা, তাপপ্রবাহ ও নদীভাঙনের মতো দুর্যোগের প্রভাব সবচেয়ে বেশি মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের গড় তাপমাত্রা ইতোমধ্যে প্রায় ০.৫ থেকে ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে এবং ভবিষ্যতে তা আরও বাড়তে পারে। অতিরিক্ত তাপপ্রবাহ, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং চরম আবহাওয়ার কারণে প্রতি বছর দেশের অর্থনীতিতে বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশের জিডিপির প্রায় ৯ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতি হতে পারে।
বাংলাদেশের প্রায় ৮০ শতাংশ অঞ্চল বন্যাপ্রবণ হওয়ায় অতিবৃষ্টি ও নদীর পানি বৃদ্ধি দেশের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত করে। একই সঙ্গে উপকূলীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে লবণাক্ততা বাড়ছে, যা কৃষি, সুপেয় পানির উৎস এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। গবেষণা বলছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা এক মিটার বৃদ্ধি পেলে দেশের প্রায় ১৭ শতাংশ ভূমি পানির নিচে চলে যেতে পারে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন প্রায় ২ থেকে ৩ কোটি মানুষ।
দেশের কৃষি খাতও জলবায়ু পরিবর্তনের বড় শিকার। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘস্থায়ী খরা, বন্যা ও লবণাক্ততার কারণে ফসল উৎপাদন কমে যাচ্ছে। পাশাপাশি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। পরিবেশগত দুর্যোগের কারণে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছেন এবং ২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় ২ কোটি মানুষ জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার, জলবায়ু সহনশীল কৃষি, বনায়ন, দুর্যোগ প্রস্তুতি এবং আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থার উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ, বায়োগ্যাস এবং বায়ুশক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি খরা, বন্যা ও লবণাক্ততা সহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবন এবং টেকসই কৃষি প্রযুক্তির সম্প্রসারণ সময়ের দাবি।
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি কমাতে বন সংরক্ষণ ও উপকূলীয় বনায়নও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এছাড়া ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, আধুনিক আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং কমিউনিটিভিত্তিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অতীতের তুলনায় প্রাণহানি কমাতে ইতিবাচক ফল দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বাংলাদেশ জলবায়ু ন্যায্যতা, অভিযোজন তহবিল এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য সহায়তার দাবিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। তবে পর্যাপ্ত জলবায়ু অর্থায়নের অভাব, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং নীতিগত চ্যালেঞ্জ দেশের অভিযোজন সক্ষমতা বৃদ্ধির পথে বড় বাধা হয়ে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের এই বহুমাত্রিক সংকট মোকাবিলায় সরকার, স্থানীয় জনগণ, গবেষক, বেসরকারি সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। কার্যকর নীতি বাস্তবায়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ, জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ এবং বৈশ্বিক সহযোগিতা জোরদারের মাধ্যমেই বাংলাদেশ একটি টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।

























