গণতন্ত্র, উদারনীতি ও স্বাধীনতার ধারণা: সলিমুল্লাহ খানের বিশ্লেষণ
- আপডেট সময় : ০৭:০০:১০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬
- / 16

অধ্যাপক ও চিন্তাবিদ সলিমুল্লাহ খান তাঁর প্রবন্ধে গণতন্ত্র, উদারনীতি (লিবারেলিজম), স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রের ধারণাকে ঐতিহাসিক ও দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর মতে, বর্তমানে বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশে যে ব্যবস্থাকে গণতন্ত্র বলা হয়, তা প্রকৃত অর্থে গণতন্ত্র নয়; বরং উদারনীতিনির্ভর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা।
প্রবন্ধে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ফরাসি বিপ্লবের মূল আদর্শ ছিল ‘স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব’। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধও ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার’-এর আদর্শে পরিচালিত হয়েছিল। কিন্তু এসব আদর্শ বাস্তবায়নে ব্যর্থতার কারণ খুঁজে বের করা জরুরি বলে তিনি মনে করেন।
সলিমুল্লাহ খানের ব্যাখ্যায়, ফরাসি দার্শনিক জঁ-জাক রুসো স্বাধীনতাকে সবার যৌথ অধিকার ও সার্বভৌমত্ব হিসেবে দেখেছিলেন। তাঁর মতে, স্বাধীনতা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর একক সম্পত্তি নয়; এটি এমন একটি অধিকার, যার ওপর সমাজের প্রত্যেক মানুষের সমান মালিকানা রয়েছে। রাষ্ট্রক্ষমতাও জনগণের সম্মিলিত অংশগ্রহণের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়া উচিত।
অন্যদিকে, ফরাসি চিন্তাবিদ বেঞ্জামিন কনস্ট্যান স্বাধীনতার ভিন্ন ব্যাখ্যা দেন। তিনি ব্যক্তিগত সম্পত্তির নিরাপত্তা ও ব্যক্তিস্বাধীনতাকেই স্বাধীনতার মূল ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেন। লেখকের মতে, এখান থেকেই আধুনিক লিবারেলিজম বা উদারনীতির সূচনা, যেখানে রাষ্ট্রের ভূমিকা সীমিত রেখে ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও ব্যক্তিস্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
প্রবন্ধে বলা হয়েছে, আধুনিক গণতন্ত্র নামে যে ব্যবস্থা প্রচলিত রয়েছে, তা মূলত উদারনীতির আদর্শ অনুসরণ করে। ফলে গণতন্ত্রের মূল লক্ষ্য হিসেবে জনগণের সমান অংশগ্রহণের পরিবর্তে ব্যক্তিগত সম্পত্তির সুরক্ষা ও বাজারভিত্তিক স্বাধীনতা বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
লেখক আরও উল্লেখ করেন, উদারনীতির প্রবক্তারা দীর্ঘদিন সর্বজনীন ভোটাধিকারেরও বিরোধিতা করেছিলেন। নারী ও সম্পত্তিহীন মানুষের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠিত হতে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। অথচ বর্তমানে তারাই গণতন্ত্রের প্রধান সমর্থক হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করেন।
সলিমুল্লাহ খান মনে করেন, প্রকৃত গণতন্ত্রের ভিত্তি হওয়া উচিত সাম্য, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং জনগণের সমান রাজনৈতিক অংশগ্রহণ। তিনি সতর্ক করে বলেন, যখন রাষ্ট্র জনগণের স্বার্থের পরিবর্তে সীমিত গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করতে শুরু করে, তখন রাষ্ট্র তার প্রকৃত চরিত্র হারায়। তাই গণতন্ত্রকে শুধু ভোটের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের সঙ্গে যুক্ত করাই সময়ের দাবি।
প্রবন্ধের উপসংহারে তিনি গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও উদারনীতির প্রচলিত ধারণাকে নতুন করে মূল্যায়নের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, প্রকৃত স্বাধীনতা তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন রাষ্ট্র, সমাজ ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সকল মানুষের সমান অধিকার ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
























