দেওয়ানি বিরোধ নিষ্পত্তির আগে অর্পিত সম্পত্তি অবমুক্ত নয়: হাইকোর্ট
- আপডেট সময় : ০৫:১৬:২৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬
- / 35

জমির স্বত্ব ও মালিকানা নিয়ে একাধিক পক্ষের মধ্যে দেওয়ানি মামলা বিচারাধীন থাকলে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির আগে সংশ্লিষ্ট জমি অর্পিত সম্পত্তির তালিকা থেকে অবমুক্ত করা যাবে না বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, উপযুক্ত দেওয়ানি আদালতে মালিকানা নির্ধারিত হওয়ার পর মামলায় বিজয়ী পক্ষের অনুকূলে সম্পত্তিটি তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
‘সাহাবুদ্দিন আহমেদ বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য’ মামলায় পৃথক দুটি রিট আবেদন নিষ্পত্তি করে এ রায় দেন বিচারপতি ফাতেমা নজীব ও বিচারপতি এ. এফ. এম. সাইফুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ। গত ১৯ মে দেওয়া ২২ পৃষ্ঠার রায়টির পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। রায়ের মূল অংশ লেখেন বিচারপতি এ. এফ. এম. সাইফুল করিম।
মামলার সূত্রপাত ফরিদপুর জেলার ৭ দশমিক ২৩ শতাংশ জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ থেকে। জমিটির মূল মালিক ছিলেন যমুনা চামার ও গয়ানাত চামার। পরবর্তী সময়ে হস্তান্তরের ধারাবাহিকতায় অনিল কুমার দত্ত জমিটির মালিক হন। পরে দানসূত্রে তাঁর ছেলে অলোক কুমার দত্ত জমিটির স্বত্ব লাভ করেন। ১৯৯৬ সালের ৮ জুলাই অলোক কুমার দত্ত রেজিস্ট্রিকৃত বিক্রয় দলিলের মাধ্যমে জমিটি শাহাবুদ্দিন আহমেদের কাছে বিক্রি করেন এবং তাঁকে দখল বুঝিয়ে দেন।
অন্যদিকে, মামলার চতুর্থ বিবাদী মো. জাহিদুর রহমানের দাবি, অলোক কুমার দত্ত ১৯৯৬ সালের ২৩ মে তাঁর সঙ্গে জমিটি বিক্রির জন্য একটি বায়নাপত্র সম্পাদন করেছিলেন। ওই চুক্তি বাস্তবায়নের দাবিতে জাহিদুর রহমান ২০০১ সালে সুনির্দিষ্ট বাস্তবায়নের মামলা করেন। সে মামলায় একই বছরের ২৮ অক্টোবর একতরফা ডিক্রি পাওয়ার পর ২০০৩ সালে আদালতের মাধ্যমে রেজিস্ট্রিকৃত দলিল সম্পাদনের অধিকার লাভ করেন তিনি।
ওই রায় ও ডিক্রির বিরুদ্ধে ২০২১ সালের ২৫ আগস্ট ফরিদপুরের জেলা জজ আদালতে টাইটেল আপিল করেন শাহাবুদ্দিন আহমেদ। বিলম্ব মার্জনার পর আপিলটি শুনানির জন্য গ্রহণ করা হলে সেই আদেশের বিরুদ্ধে দেওয়ানি কার্যবিধির ১১৫(১) ধারায় হাইকোর্টে সিভিল রিভিশন দায়ের করেন জাহিদুর রহমান। শুনানি শেষে হাইকোর্ট সংশ্লিষ্ট রুল যথাযথ ঘোষণা করে আগের আদেশ বাতিল করেন এবং আপিল গ্রহণের বিষয়ে নতুন করে শুনানি করতে ফরিদপুরের জেলা জজকে নির্দেশ দেন।
নির্দেশনা অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ২৫ মে জেলা জজ আপিলটি গ্রহণ করেন। ওই আদেশে অসন্তুষ্ট হয়ে ২০২৪ সালে জাহিদুর রহমান আবারও হাইকোর্টে সিভিল রিভিশন দায়ের করেন। একই বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট রুল জারির পাশাপাশি অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ দেন। সংশ্লিষ্ট সিভিল রিভিশনটি এখনো হাইকোর্ট বিভাগে বিচারাধীন রয়েছে।
শুনানিতে শাহাবুদ্দিন আহমেদের আইনজীবী জাকির হোসেন ভূঁইয়া আদালতকে জানান, ১৯৯৬ সালের রেজিস্ট্রিকৃত দলিলের মাধ্যমে জমির স্বত্ব অর্জনের পর থেকে তাঁর মক্কেল তা ভোগদখল করে আসছেন। তাঁর যুক্তি, ২০০১ সালের চুক্তি বাস্তবায়নের মামলায় শাহাবুদ্দিন আহমেদকে পক্ষভুক্ত করা হয়নি। ফলে ওই মামলার ডিক্রি ও পরবর্তী দলিলের আইনগত কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এ ছাড়া তাঁর দাবি, আগের রেজিস্ট্রিকৃত দলিলটি পরবর্তী দলিলের ওপর আইনগত প্রাধান্য পাবে।
অন্যদিকে, জাহিদুর রহমানের আইনজীবী মো. নাসির শিকদার দাবি করেন, তাঁর মক্কেলের বায়নাপত্রটি শাহাবুদ্দিন আহমেদের বিক্রয় দলিলের আগেই, ১৯৯৬ সালের ২৩ মে সম্পাদিত হয়েছিল। আদালতের ডিক্রির ভিত্তিতে অর্জিত স্বত্ব ও দলিলের কারণে তাঁর মক্কেলের অবস্থান আইনসম্মত বলেও যুক্তি দেন তিনি। এ সময় আইনজীবী মিতুল ভৌমিক বিবাদীপক্ষকে সহায়তা করেন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মির্জা আল মাহমুদ ও আখতার হোসেন মো. আবদুল ওহাব।
রায়ে হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণ করেন, অলোক কুমার দত্ত ও জাহিদুর রহমানের মধ্যে সম্পাদিত বায়নাপত্রের ভিত্তিতে দায়ের করা টাইটেল মামলার রায় ও ডিক্রি নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। পাশাপাশি শাহাবুদ্দিন আহমেদের নামে সম্পাদিত বিক্রয় দলিলের বৈধতা নিয়েও বিরোধ রয়েছে। এসব বিষয় সংক্ষিপ্ত রিট কার্যক্রমের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা সম্ভব নয় বলে মত দেন আদালত।
আদালত আরও বলেন, বিরোধপূর্ণ সম্পত্তির মালিকানা ও স্বত্ব আগে উপযুক্ত দেওয়ানি আদালতের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে। এর আগে সম্পত্তিটি শাহাবুদ্দিন আহমেদ কিংবা জাহিদুর রহমান—কোনো পক্ষের অনুকূলেই অর্পিত সম্পত্তির তালিকা থেকে অবমুক্ত করা উচিত হবে না।
রায়ের নির্দেশনায় ফরিদপুরের জেলা প্রশাসককে বলা হয়েছে, হাইকোর্টে বিচারাধীন সিভিল রিভিশনে চূড়ান্তভাবে যে পক্ষের অনুকূলে সম্পত্তির মালিকানা নির্ধারিত হবে, সেই পক্ষের অনুকূলে বিরোধীয় জমি অবমুক্ত করার ব্যবস্থা নিতে হবে। তত দিন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে জমির দখলসংক্রান্ত বিষয়ে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।


























