হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান পালটাপালটি হামলা, বাড়ছে বিশ্ব জ্বালানি সংকটের শঙ্কা
- আপডেট সময় : ০৫:৩৩:০৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 111

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত নতুন মাত্রা পেয়েছে। মাসব্যাপী এই লড়াই এখন সমুদ্রপথেও ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হরমুজ প্রণালি ঘিরে দুই দেশের পালটাপালটি সামরিক পদক্ষেপে উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একে অপরের বিরুদ্ধে হামলা চালিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র তিনটি ইরানি তেল ট্যাংকারে হামলা চালানোর দাবি করেছে। এর জবাবে হরমুজ প্রণালির কাছে অবস্থানরত মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজ লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের দাবি করেছে ইরান।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, তাদের বাহিনী তিনটি ইরানি জাহাজে হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে একটি খার্গ দ্বীপের কাছে, একটি জাস্ক বন্দরের কাছে এবং অন্যটি ওমান উপসাগরে অবস্থান করছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার লক্ষ্য ছিল একটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ও একটি ডেস্ট্রয়ার। তবে মার্কিন বাহিনী হামলা প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে এবং এতে কোনো মার্কিন সেনা হতাহত হয়নি।
অন্যদিকে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা মার্কিন যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে সতর্ক করেছে তেহরান।
ট্যাংকারে হামলার কারণ
যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, ইরানি তেল ট্যাংকারগুলো নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তেল বিক্রির একটি গোপন নেটওয়ার্কের অংশ। এসব তেল বিক্রির আয় ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) ও তাদের মিত্রগোষ্ঠীগুলোর কাছে পৌঁছায় বলে দাবি ওয়াশিংটনের।
অন্যদিকে ইরানের বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তেহরানের ওপর চাপ তৈরির কৌশল। নিজেদের তেল রপ্তানি ও সামুদ্রিক চলাচল রক্ষায় পালটা ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছে ইরান।
বিশ্ব জ্বালানি বাজারে প্রভাব
হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ হয়। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হতো। ফলে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সংঘাত বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সংঘাতের প্রভাবে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯৬ দশমিক ২৮ ডলারে পৌঁছেছে, যা যুদ্ধ শুরুর আগে ছিল প্রায় ৭০ ডলার। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তেলের দাম আরও বেড়ে যেতে পারে।
সংঘাত কোন দিকে যাচ্ছে?
জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য অধ্যয়ন কর্মসূচির পরিচালক সিনা আজোদির মতে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক পালটাপালটি হামলা সংঘাত আরও বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তার মতে, কোনো পক্ষই এখন সহজে পিছু হটবে না। রাজনৈতিক সমাধান না হলে সংঘর্ষ আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে এবং বেসামরিক হতাহতের ঝুঁকিও বাড়বে।
আজোদি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আরও সেনা পাঠাতে পারে। তবে ইরানও অবরোধ প্রতিরোধ করলে পালটা চাপ বাড়াতে পারে। শেষ পর্যন্ত যে পক্ষ ক্ষয়ক্ষতি ও চাপ বেশি সহ্য করতে পারবে, তারাই সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে।
অন্যদিকে তেহরানের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটিজিক স্টাডিজের বিশ্লেষক আলী আকবর দারেইনি বলেন, ইরানি তেল ট্যাংকারে মার্কিন হামলা তেহরানকে আরও কঠোর প্রতিশোধ নিতে উৎসাহিত করবে। তার মতে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও নৌ অবরোধের পাশাপাশি ইরান অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করবে। একই সঙ্গে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে নেওয়ারও চেষ্টা করতে পারে তেহরান।
হরমুজ প্রণালি ঘিরে চলমান এই উত্তেজনা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের জন্য নয়, বরং পুরো বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথে সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়লে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাজারে এর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।



























