অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে তিতুমীরের তিন ধাপের কৌশল, লক্ষ্য দ্রুত প্রবৃদ্ধি
- আপডেট সময় : ০৫:০৪:৪০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬
- / 38

গভীর অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে দেশকে আবারও টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে ফেরাতে এবং দ্রুত অর্থনৈতিক সম্প্রসারণ নিশ্চিত করতে তিন ধাপের কৌশল প্রস্তাব করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদি সংস্কার ও উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রস্তাবিত এই কৌশলের তিন ধাপ হলো—‘রিকভারি’ বা পুনরুদ্ধার, ‘রেস্টোরেশন’ বা পুনঃস্থাপন এবং ‘রিকনস্ট্রাকশন ফর অ্যাকসিলারেশন’ অর্থাৎ দ্রুত প্রবৃদ্ধির জন্য পুনর্গঠন।
রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাসসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিতুমীর বলেন, ধাপগুলো ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রথমে অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা হবে। এরপর উৎপাদন ও বিনিয়োগের গতি বাড়িয়ে টেকসই প্রবৃদ্ধির ভিত্তি তৈরি করা হবে।
তিন ধাপের প্রথমটি ‘রিকভারি’। এই পর্যায়ের প্রধান উদ্দেশ্য হলো অর্থনীতির হারানো সক্ষমতা ফিরিয়ে আনা এবং সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা।
তিতুমীরের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথম পর্যায়ে সরকারের তাৎক্ষণিক মনোযোগ থাকবে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায়। ঋণের চাপ, দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, তারল্যসংকট, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে পতন এবং অর্থনীতির প্রতি মানুষের আস্থা পুনর্গঠন—এসব বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এ জন্য রাজস্ব ও মুদ্রানীতির মধ্যে আরও কার্যকর সমন্বয়, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফেরাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
রাজস্ব আয়ের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিতুমীর জানান, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত রাজস্ব আয় ১২ শতাংশ বেড়েছে। আগের বছরের একই সময়ে রাজস্ব আয়ের প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ২ শতাংশ। তার মতে, এটি রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক অগ্রগতির একটি লক্ষণ।
তবে নতুন করে বিদ্যমান করদাতাদের ওপর চাপ না বাড়িয়ে করের আওতা বিস্তৃত করা এবং কর ফাঁকি বন্ধের দিকে সরকার বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বলেও জানান তিনি।
অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর আরও কিছু ইতিবাচক সূচক হিসেবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি, টাকার মূল্যমান শক্তিশালী হওয়া, প্রবাসী আয় বৃদ্ধি এবং সুদের হার কমে আসার বিষয়গুলো উল্লেখ করেন অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা।
এরপর দ্বিতীয় পর্যায় ‘রেস্টোরেশন’ বা পুনঃস্থাপন। এ পর্যায়ের উদ্দেশ্য শুধু অর্থনীতিকে স্থিতিশীল অবস্থায় নিয়ে আসা নয়; বরং উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়িয়ে টেকসই এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা।
তিতুমীর বলেন, এই পর্যায়ে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান পুনরুদ্ধার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ ও নিয়ন্ত্রণ কমানোর পাশাপাশি প্রস্তাবিত ‘ট্রেস অ্যান্ড ট্র্যাক’ পদ্ধতি চালুর মাধ্যমে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
একই সঙ্গে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার হিসেবে প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
তার তথ্য অনুযায়ী, উত্তর আমেরিকা, পশ্চিম ইউরোপ, উপসাগরীয় অঞ্চল এবং পূর্ব এশিয়া থেকে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি এসেছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চলে এসব বিনিয়োগের আগ্রহ রয়েছে।
সরকার এমন বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দিতে চায়, যা দেশের উৎপাদন বাড়াবে, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করবে এবং রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে। অন্যদিকে ঋণ ও আমদানিনির্ভর প্রকল্পকে অতিরিক্ত অগ্রাধিকার দেওয়া হবে না।
অগ্রাধিকার পাওয়া খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে কৃষি ও কৃষিপণ্য, ইলেকট্রনিকস, ওষুধশিল্প, চামড়াজাত পণ্য এবং হালকা প্রকৌশল।
পুনঃস্থাপন পর্যায়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি সামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিত করার পরিকল্পনাও রয়েছে। এজন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ, প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কার এবং স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
তৃতীয় পর্যায়ের নাম ‘রিকনস্ট্রাকশন ফর অ্যাকসিলারেশন’ বা দ্রুত প্রবৃদ্ধির জন্য পুনর্গঠন। এ পর্যায়ের প্রধান লক্ষ্য হবে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার সম্পন্ন করা এবং অর্থনীতিকে দ্রুত সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামো তৈরি করা।
তিতুমীর বলেন, অর্থনীতির পুনরুদ্ধার ও পুনঃস্থাপন পর্যায়ে যে অগ্রগতি অর্জিত হবে, সেটিকে দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখতে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর পুনর্গঠন জরুরি। এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতেও বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
কৌশল অনুযায়ী, প্রথমে জ্বালানি খাতে তাৎক্ষণিক স্থিতিশীলতা আনা হবে। পরে অর্থনীতির প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এ খাতের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এর পরের ধাপে সৌরবিদ্যুৎ এবং নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।
তিতুমীর বলেন, ‘দেশের মানুষ এখন আর শুধু গ্রাহক নন, তিনি একজন উৎপাদকও।’
তার মতে, তিনটি ধাপকে আলাদা কোনো কর্মসূচি হিসেবে দেখলে হবে না। এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। প্রথমে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা হবে, এরপর উৎপাদন সক্ষমতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি ফিরিয়ে আনা হবে এবং সবশেষে দ্রুত অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো পুনর্গঠন করা হবে।
বর্তমান সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের অতীত অর্থনৈতিক রূপান্তর থেকেও শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন তিতুমীর।
তিনি জানান, সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ের পর বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি এবং প্রবাসী আয় বাড়ার ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছিল। পরবর্তী সময়ে নারীদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং তৈরি পোশাক খাতের বিকাশও দেখিয়েছে, সঠিক কৌশলগত নীতিগত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে কাঠামোগত দুর্বলতাকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব।
বর্তমান পরিকল্পনাতেও দেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক শক্তিগুলো চিহ্নিত করে বাস্তবভিত্তিক নীতিগত পদক্ষেপের মাধ্যমে সেগুলোকে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।
সরকারের প্রথম ১৮০ দিনকে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়ায় প্রাথমিক অগ্রগতির সময় হিসেবে উল্লেখ করে তিতুমীর বলেন, শেষ পর্যন্ত সংকট মোকাবিলার পর্যায় পেরিয়ে বাংলাদেশকে একটি স্থিতিশীল, উৎপাদনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতিতে রূপান্তর করাই সরকারের লক্ষ্য।
তিনি বলেন, ‘রিকভারি, রেস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন ফর অ্যাকসিলারেশন’—এই তিন ধাপের পরিকল্পনার মাধ্যমে একদিকে হারানো অবস্থান ফিরে পাওয়া, অন্যদিকে অর্থনীতির গতি পুনরুদ্ধার এবং সর্বশেষ দ্রুত প্রবৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি করা হবে।

























