কৃষি ও পল্লী ঋণের লক্ষ্যমাত্রা বেড়ে ৬০ হাজার কোটি টাকা
- আপডেট সময় : ০৬:২৩:৪৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬
- / 38

কৃষি খাতে ঋণের প্রবাহ বাড়াতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ৬০ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আগের অর্থবছরের ৩৯ হাজার কোটি টাকার তুলনায় নতুন লক্ষ্যমাত্রা বেড়েছে ২১ হাজার কোটি টাকা বা ৫৩ দশমিক ৮ শতাংশ।
সোমবার (১৭ আগস্ট) বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের কৃষি ও পল্লী ঋণ নীতিমালা ও কর্মসূচি ঘোষণা অনুষ্ঠানে এ তথ্য জানানো হয়।
নতুন লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে রাষ্ট্র মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর জন্য ২০ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা এবং বেসরকারি ও বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকের জন্য ৩৯ হাজার ১৫৫ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে কৃষি খাতে ঋণ বিতরণে বেসরকারি ও বিদেশি ব্যাংকের অংশগ্রহণও বাড়ছে।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. হাবিবুর রহমান বলেন, জাতীয় আয়ে কৃষির অবদান বিবেচনায় কৃষি খাতে ঋণের অংশ এখনো তুলনামূলক কম। এ কারণে মোট ঋণের মধ্যে কৃষি ঋণের অংশ আড়াই শতাংশ থেকে বাড়িয়ে চার শতাংশ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এ অংশ আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, কৃষিকে স্বনির্ভর এবং কৃষককে অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম করাই কৃষি ঋণ বাড়ানোর মূল উদ্দেশ্য। কৃষক যেন ঋণ নিয়ে উৎপাদন বাড়াতে পারেন এবং নিয়মিত ঋণ পরিশোধের মাধ্যমে ভবিষ্যতে আরও বড় ঋণ পাওয়ার সক্ষমতা অর্জন করতে পারেন, সে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
কৃষি ঋণের প্রকৃত সুবিধাভোগী নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে ডেপুটি গভর্নর বলেন, সঠিক সময়ে প্রকৃত কৃষকের হাতে ঋণ পৌঁছানোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কেউ প্রকৃত কৃষক না হয়েও ঋণ পেলে তা অন্য খাতে ব্যবহারের ঝুঁকি থাকে। এমনকি ঋণের অর্থের অপব্যবহার অর্থপাচারের দৃষ্টিকোণ থেকেও বিবেচিত হতে পারে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কৃষক কার্ডধারীদের ঋণ দেওয়াকে তুলনামূলক নিরাপদ উল্লেখ করে তিনি বলেন, কৃষক কার্ড না থাকলে ব্যাংককে নিশ্চিত হতে হবে যে ঋণগ্রহীতা প্রকৃত কৃষক কি না। যাচাই ছাড়া ঋণ দিলে এর দায়ভার সংশ্লিষ্ট ব্যাংককেই নিতে হবে।
কৃষি ঋণ বিতরণে মধ্যস্বত্বভোগী ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে বলেও স্বীকার করেন ড. হাবিবুর রহমান। প্রকৃত কৃষকের হাতে ঋণ পৌঁছাচ্ছে কি না এবং ঋণের অর্থ সঠিক কাজে ব্যবহার হচ্ছে কি না, তা যাচাইয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়মিত জরিপ ও পর্যবেক্ষণ করে। ভবিষ্যতে এ নজরদারি আরও বাড়ানো হবে বলে জানান তিনি।
নতুন নীতিমালায় অঞ্চলভেদে কৃষির ধরন ও চাহিদা বিবেচনায় ঋণ বিতরণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এজন্য ‘এরিয়া অ্যাপ্রোচ’ পদ্ধতি অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকগুলো ক্রপ জোনিং, ‘খামারি’ অ্যাপস, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, মৎস্য অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সংস্থার তথ্য ব্যবহার করে অঞ্চলভিত্তিক ঋণের চাহিদা নির্ধারণ করতে পারবে।
ড. হাবিবুর রহমান বলেন, কোনো এলাকায় ধান, কোথাও আলু আবার কোথাও মাছ বেশি উৎপাদিত হলে সে অনুযায়ী ঋণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে। জমির পরিমাণ, উৎপাদন ব্যয়, সার, বীজ ও শ্রমিকের খরচসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করে ঋণের সীমা নির্ধারণ করা হবে।
নতুন নীতিমালায় নারী ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য জামানতবিহীন ঋণ এবং বিকল্প জামানতের সুযোগ বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতেও ঋণ বিতরণ সম্প্রসারণ করা হয়েছে। পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ আবেদনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু চার্জ ডকুমেন্ট ছাড়া অন্য কোনো চার্জ ডকুমেন্ট গ্রহণ না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া হাঁস-মুরগির বাচ্চা উৎপাদন, হ্যাচারি, মাছের পোনা উৎপাদনসহ বিভিন্ন খাতকে ঋণের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, চুক্তিভিত্তিক কৃষি, নতুন ফসলের উৎপাদন এবং কৃষিপণ্যের সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কৃষি খাতের জন্য ১০ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন স্কিম এবং ৩ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের নীতিমালার সারসংক্ষেপও নতুন কর্মসূচিতে যুক্ত করা হয়েছে। ক্ষুদ্র কৃষক, নতুন উদ্যোক্তা ও নির্দিষ্ট উৎপাদন খাতকে ঋণের আওতায় আনতে সুযোগ সম্প্রসারণের কথা বলা হয়েছে।
ডেপুটি গভর্নর বলেন, কৃষি ও পল্লী ঋণের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানোর উদ্দেশ্য শুধু ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি করা নয়; বরং প্রকৃত কৃষকের কাছে ঋণ পৌঁছানো এবং উৎপাদনশীল কাজে এর ব্যবহার নিশ্চিত করা। ঋণ বিতরণে কোনো ব্যত্যয় যাতে না ঘটে, সে বিষয়ে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রকৃত কৃষক শনাক্তকরণ, ঋণের সঠিক ব্যবহার এবং সময়মতো ঋণ বিতরণ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব টিম বিষয়টি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করবে বলেও জানান তিনি।

























