দেশের পোশাক খাতে সংকট ঘনীভূত: তিন বছরে বন্ধ ২৫৬ কারখানা, চাকরি হারিয়েছেন হাজারো শ্রমিক
- আপডেট সময় : ০৫:৩২:২১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬
- / 8

বৈশ্বিক চাহিদা হ্রাস, জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ নানা সমস্যার কারণে দেশের তৈরি পোশাক খাত বর্তমানে কঠিন সময় পার করছে। ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট এবং কিছু ক্ষেত্রে শ্রমিক অসন্তোষের প্রভাবে গড়ে প্রতি মাসে ৩ থেকে ৪টি কারখানা বন্ধ হচ্ছে। এর ফলে শুধু গত ছয় মাসেই ১৯ হাজারের বেশি শ্রমিক কর্মহীন হয়েছেন বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারারস অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি হাসান মাহমুদ খান।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনেক কারখানা উৎপাদন সক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগাতে না পারায় দীর্ঘদিন লোকসান গুনে শেষ পর্যন্ত কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। যদিও একই সময়ে নতুন কিছু কারখানা চালু হয়েছে, তবে তা বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানার প্রভাব কাটিয়ে উঠতে কিংবা রপ্তানি আয়কে ইতিবাচক ধারায় ফেরাতে যথেষ্ট নয়।
সম্প্রতি শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের পোশাক রপ্তানি আয় আগের বছরের তুলনায় ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৩৮ দশমিক ৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। যদিও কোভিড-পরবর্তী সময়ে এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বেশিরভাগ সময় পোশাক রপ্তানিতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি ছিল। ২০২৫ সালের জুনে রপ্তানি কমতে শুরু করে এবং ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত টানা আট মাস খাতটি নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির মুখে পড়ে। গত এপ্রিলে সাময়িকভাবে ৩১ দশমিক ২১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও পরের মাসেই আবার রপ্তানি কমে যায়।
তিন বছরে বন্ধ ২৫৬ কারখানা
বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছর দুই মাসে দেশে মোট ২৫৬টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে। একই সময়ে নতুন চালু হয়েছে ৩২৩টি কারখানা। ২০২৩ সালে ৩৫টি, ২০২৪ সালে ৭৭টি, ২০২৫ সালে ১৪১টি এবং চলতি বছরের প্রথম দুই মাসে আরও তিনটি কারখানা বন্ধ হয়। অন্যদিকে একই সময়ে নতুন কারখানা চালুর সংখ্যা যথাক্রমে ১৩৫, ১০৬, ৮৫ এবং ১৮টি। ফেব্রুয়ারি শেষে বিজিএমইএর অধীনে সচল কারখানার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ১২৭টি।
ইউরোপের বাজারে রপ্তানি কমেছে
ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো বিশ্ববাজার থেকে পোশাক আমদানি ১০ দশমিক ৪২ শতাংশ কমিয়েছে। একই সময়ে বাংলাদেশ থেকে ওই বাজারে পোশাক রপ্তানি কমেছে ১৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ। সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে ইউরোপীয় বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ৩ দশমিক ২৯ শতাংশ কমে ১৯ দশমিক ০৬ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে।
তবে অন্যান্য প্রধান বাজারে কিছুটা ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। বিদায়ী অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে ২ দশমিক ৬৩ শতাংশ, যুক্তরাজ্যে শূন্য দশমিক ৯১ শতাংশ এবং কানাডায় ৩ দশমিক ২ শতাংশ রপ্তানি বেড়েছে। এ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে ৭ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন, যুক্তরাজ্যে ৪ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন এবং কানাডায় ১ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ।
বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা ও প্রতিযোগিতা বাড়ছে
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির প্রভাব বিশ্বজুড়ে পোশাক বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
তিনি বলেন, দেশের ব্যবসা পরিচালনার ব্যয়ও ক্রমাগত বাড়ছে। জ্বালানি, পরিবহন ও অন্যান্য খরচ বৃদ্ধির কারণে উদ্যোক্তারা চাপে রয়েছেন। বাজেটে ঘোষিত বন্ড সুবিধা সম্প্রসারণ, দ্রুত পণ্য ছাড় এবং বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা বাস্তবায়ন হলে খাতটি কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে বলে তিনি মত দেন।
বন্ধ হচ্ছে পুরনো কারখানা
সম্প্রতি লিথি গ্রুপের অ্যাপারেল-২১, আল মুসলিম গ্রুপ, গাজীপুরের ইউনিক ওয়াশিং অ্যান্ড ডায়িং এবং ইউনিক ডিজাইনার্সসহ কয়েকটি পরিচিত কারখানা কার্যক্রম বন্ধ করেছে। এছাড়া আর্থিক সংকট, ঋণ জটিলতা এবং তারল্য সমস্যার কারণে বড় কয়েকটি শিল্পগ্রুপের কারখানাও উৎপাদন বন্ধ রেখেছে।
বিজিএমইএর সদস্য নয়—এমন আরও শতাধিক কারখানাও গত তিন বছরে বন্ধ হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এসব প্রতিষ্ঠানে কয়েক হাজার শ্রমিক কর্মরত ছিলেন।
শিল্প প্রবৃদ্ধিতেও প্রভাব
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শিল্পখাতের প্রবৃদ্ধি কমে ২ দশমিক ৮৬ শতাংশে নেমে এসেছে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৩ দশমিক ৭১ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, পোশাক খাতের সংকট শিল্পখাতের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
উদ্যোক্তাদের উদ্বেগ
বিজিএমইএ সভাপতি হাসান মাহমুদ খান বলেন, দৃশ্যমানভাবে যেসব কারখানা বন্ধ হয়েছে, তার বাইরেও অনেক প্রতিষ্ঠান লোকসান গুনে টিকে আছে। জ্বালানি সংকট এবং ঘন ঘন বিদ্যুতের দাম বাড়ানো শিল্পের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিজিএমইএর পরিচালক ফয়সাল সামাদ বলেন, কোভিড-পরবর্তী সময় এবং ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে পোশাকের চাহিদা কমেছে। পাশাপাশি অনেক কারখানার নিজস্ব অদক্ষতাও সংকটকে বাড়িয়েছে। কেন কারখানা বন্ধ হচ্ছে এবং এর প্রভাব কী—তা জানতে বিজিএমইএ একটি সমীক্ষা পরিচালনা করছে, যা চলতি জুলাইয়ের মধ্যেই শেষ হওয়ার কথা।
ডেনিম এক্সপোর্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, শুধু অর্ডার কমে যাওয়াই নয়, অনেক কারখানা এখনো পুরনো প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, ফলে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে। তিনি খাতভিত্তিক প্রয়োজন অনুযায়ী সরকারের সহায়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অন্যদিকে বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, প্রতি মাসেই নিটিং ও টেক্সটাইল খাতে কয়েকটি কারখানা বন্ধ হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। তাঁর মতে, মাঝারি ও ছোট কারখানাগুলোকে টিকিয়ে রাখতে সরকারের একটি দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে পোশাক খাতে কর্মসংস্থান আরও কমে যেতে পারে, যার প্রভাব দেশের সামগ্রিক শ্রমবাজার ও অর্থনীতিতেও পড়বে। তাই জ্বালানি সংকট নিরসন, উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, অর্থায়ন সহজীকরণ এবং প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
























