ভোলার গ্যাসে নতুন সম্ভাবনা, জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার উদ্যোগ
- আপডেট সময় : ০৪:১৫:৫০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬
- / 53

দেশে গ্যাসের ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং আমদানিনির্ভর এলএনজির ওপর বাড়তি চাপের কারণে ভোলার গ্যাসসম্পদ নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরও সঞ্চালন অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতায় ভোলার গ্যাসের বড় একটি অংশ ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ফলে দ্রুত এই গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার পাশাপাশি স্থানীয় শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহারের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
ভোলার শাহবাজপুর, ভোলা-নর্থ ও ইলিশা—এই তিনটি আবিষ্কৃত গ্যাসক্ষেত্রে সম্মিলিতভাবে প্রায় ২ দশমিক ০৪৭ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) গ্যাসের মজুত রয়েছে। এর মধ্যে আনুমানিক ১ দশমিক ৪৩২ থেকে ১ দশমিক ৪৩৩ টিসিএফ গ্যাস উত্তোলনযোগ্য।
জ্বালানি মন্ত্রণালয় ও পেট্রোবাংলার সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে অবশিষ্ট উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের পরিমাণ প্রায় ৭ দশমিক ৬৩ টিসিএফ। সে হিসাবে দেশের অবশিষ্ট উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের প্রায় ১৯ শতাংশই ভোলায় রয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন কূপ খনন, উৎপাদন পরীক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ভোলার প্রকৃত উত্তোলনযোগ্য গ্যাসসম্পদ সম্পর্কে আরও নির্ভুল ধারণা পাওয়া সম্ভব।
বাপেক্সের তথ্য অনুযায়ী, ভোলার নয়টি কূপ থেকে দৈনিক প্রায় ১৮২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। বর্তমানে এর মধ্যে প্রায় ৭৫ মিলিয়ন ঘনফুট ব্যবহার করা হচ্ছে। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে আরও প্রায় ৪৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস অব্যবহৃত রয়েছে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. আব্দুল মান্নান বলেন, ভোলার গ্যাস কাজে লাগাতে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি সঞ্চালন অবকাঠামোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। গ্যাসের মজুত থাকলেও তা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছানোর ব্যবস্থা না থাকলে জাতীয় অর্থনীতিতে প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যাবে না।
দেশের সামগ্রিক গ্যাস পরিস্থিতিও ভোলার গুরুত্ব বাড়িয়েছে। গত ১৫ সেপ্টেম্বর জাতীয় গ্রিডে দৈনিক ২ হাজার ৬০৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে আসে প্রায় ১ হাজার ৬২০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং আমদানিকৃত এলএনজি থেকে প্রায় ৯৯০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে গ্যাস সরবরাহে আমদানির ওপর নির্ভরতা এখনো উল্লেখযোগ্য।
এলএনজি আমদানি স্বল্পমেয়াদে ঘাটতি সামাল দিতে সহায়তা করলেও এর সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারের দামের ওঠানামার ঝুঁকি রয়েছে। তাই দেশীয় উৎস থেকে উৎপাদন বাড়ানো এবং অব্যবহৃত গ্যাসকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এই পরিস্থিতিতে ভোলা-বরিশাল গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন নির্মাণের উদ্যোগ বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেডের (জিটিসিএল) তথ্য অনুযায়ী, ভোলা-বরিশাল গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন নির্মাণের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শেষ হয়েছে এবং প্রকল্পের ডিপিপি প্রণয়নের কাজ চলছে।
এ ছাড়া ভোলা-বরিশাল-খুলনা রুটে পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনাও সামনে এসেছে। এটি বাস্তবায়িত হলে ভোলার গ্যাস দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। খুলনা পর্যন্ত সঞ্চালন অবকাঠামো গড়ে উঠলে পরবর্তী সময়ে বৃহত্তর জাতীয় গ্যাস ব্যবস্থার সঙ্গে সংযোগও সহজ হতে পারে।
ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলে এর সুফল শুধু ভোলা বা বরিশালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। খুলনা ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শিল্পাঞ্চল, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং অন্যান্য গ্যাসনির্ভর প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমানো এবং এলএনজির ওপর নির্ভরতা হ্রাসের সম্ভাবনাও তৈরি হবে।
তবে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহই একমাত্র সম্ভাবনা নয়। ভোলায় পর্যাপ্ত ও নির্ভরযোগ্য গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে সার কারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, গ্যাসভিত্তিক শিল্প, শিল্পপার্ক ও অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ভোলায় গ্যাসের নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত হলে স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহও বাড়তে পারে। তবে এর জন্য গ্যাসের পাশাপাশি সড়ক যোগাযোগ, নদীবন্দর, বিদ্যুৎ, পানি, আবাসন এবং দক্ষ জনশক্তির অবকাঠামোও উন্নত করতে হবে।
ভোলায় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। বাপেক্সের তথ্য অনুযায়ী, ভোলা নর্থ-১, ভোলা নর্থ-২ ও ইলিশা-১ কূপ থেকে অতিরিক্ত ৬০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের লক্ষ্যে প্রসেস প্ল্যান্ট স্থাপনের কাজ চলছে। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে এ কাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।
এর পাশাপাশি ভোলায় আরও পাঁচটি নতুন গ্যাসকূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব কূপ সফল হলে ভবিষ্যতে গ্যাস উৎপাদন আরও বাড়তে পারে। তাই শুধু বর্তমান গ্যাস ব্যবহারের জন্য নয়, ভবিষ্যৎ উৎপাদন বিবেচনায় নিয়েও সঞ্চালন অবকাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।
ভোলার গ্যাসের সম্ভাবনা বর্তমান মজুতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বাপেক্স ও রাশিয়ার গ্যাসপ্রমের অনুসন্ধানে জেলার বিভিন্ন এলাকায় আরও গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে। বিশেষ করে চরফ্যাশনসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় নতুন অনুসন্ধানের মাধ্যমে গ্যাসসম্পদের পরিমাণ আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ভোলার গ্যাসের সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয়টিও সরাসরি যুক্ত। পর্যাপ্ত গ্যাসের অভাবে দেশে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র তাদের পূর্ণ উৎপাদন সক্ষমতা কাজে লাগাতে পারে না। ভোলার গ্যাস স্থানীয়ভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করা গেলে দক্ষিণাঞ্চলের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাও শক্তিশালী হতে পারে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, ভোলার গ্যাস ব্যবহার, মালয়েশিয়া থেকে গ্যাস আমদানি এবং সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. বদরুল ইমাম বলেন, ভোলার গ্যাসের অর্থনৈতিক মূল্য শুধু কত মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাবে, তা দিয়ে নির্ধারণ করা যাবে না। গ্যাসটি কোথায় ব্যবহার করলে দেশের অর্থনীতিতে সর্বোচ্চ মূল্য সংযোজন হবে, তা নির্ধারণ করতে হবে। বিদ্যুৎ, সার, শিল্পকারখানা ও জাতীয় গ্রিড—সব বিকল্পের ব্যয় ও সুফল তুলনা করে দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, বড় বিনিয়োগের আগে ভোলার প্রকৃত উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের পরিমাণ নির্ধারণ করা জরুরি। সম্ভাব্য মজুত এবং বাস্তবে অর্থনৈতিকভাবে উত্তোলনযোগ্য গ্যাস এক বিষয় নয়। অনুসন্ধান, কূপ খনন, উৎপাদন পরীক্ষা এবং সময়ের সঙ্গে কূপের চাপ ও উৎপাদন সক্ষমতা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে প্রকৃত সম্ভাবনা নির্ধারণ করতে হয়।
ভোলার শিল্পোদ্যোক্তারাও গ্যাসের নির্ভরযোগ্য সরবরাহকে শিল্পায়নের অন্যতম পূর্বশর্ত হিসেবে দেখছেন। ভোলা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক মো. জামাল উদ্দিন খান বলেন, গ্যাসের নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত হলে ভোলায় শিল্প স্থাপনে আগ্রহ বাড়তে পারে। তবে গ্যাসের পাশাপাশি বিদ্যুৎ, সড়ক, নদীবন্দর, যোগাযোগ ও শিল্প অবকাঠামোও একসঙ্গে উন্নত করতে হবে।
সরকারের সাম্প্রতিক জ্বালানি পরিকল্পনাতেও ভোলার গ্যাস গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মধ্যে ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার বিষয়টি রয়েছে। ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে নিতে ৫০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প এবং বাপেক্সের ১৫০টি কূপ খনন ও পুনঃখননের কাজ এগিয়ে চলার কথাও জানান তিনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভোলার গ্যাস ব্যবহারে কোনো একটি খাতের ওপর নির্ভর না করে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। জাতীয় গ্রিডে কতটা গ্যাস যাবে, স্থানীয় শিল্পে কতটা ব্যবহার হবে, বিদ্যুৎ উৎপাদনে কতটা দেওয়া হবে এবং ভবিষ্যৎ উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য কতটা সক্ষমতা রাখা হবে—এসব বিষয় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
একই সঙ্গে ভোলার ভৌগোলিক অবস্থান, নদী ও উপকূলীয় পরিবেশ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকার বিষয়ও বিবেচনায় রাখতে হবে। নতুন শিল্পায়নের মাধ্যমে স্থানীয় জনগণের কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরির বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়া, এলএনজি আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় এবং শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের বাড়তি চাহিদার বাস্তবতায় ভোলার গ্যাস একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সম্পদ। অবকাঠামোর অভাবে বর্তমানে যে গ্যাস ব্যবহার করা যাচ্ছে না, তা দ্রুত কাজে লাগাতে পারলে নতুন বড় গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের আগেই দেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় অতিরিক্ত সরবরাহ যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ভোলায় প্রায় ১ দশমিক ৪৩৩ টিসিএফ উত্তোলনযোগ্য গ্যাস রয়েছে, যা দেশের অবশিষ্ট উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশের সমপরিমাণ। নতুন অনুসন্ধানে আরও গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। ফলে ভোলাকে শুধু আঞ্চলিক একটি গ্যাসক্ষেত্র হিসেবে নয়, বরং জাতীয় জ্বালানি পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে অনুসন্ধান, উৎপাদন, প্রসেসিং, সঞ্চালন, শিল্পায়ন ও পরিবেশ সুরক্ষাকে সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে।























