নতুন সাইবার সুরক্ষা আইন পাস: ডিপফেইক, হ্যাকিং ও অনলাইন প্রতারণায় কঠোর শাস্তি
- আপডেট সময় : ০৫:৩৩:৩৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬
- / 18

বাংলাদেশে সাইবার অপরাধ প্রতিরোধ, ডিজিটাল নিরাপত্তা জোরদার এবং সাইবার স্পেসে সংঘটিত অপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে জাতীয় সংসদে সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬ পাস হয়েছে। গত ৩০ জুন সংসদে বিলটি অনুমোদন দেওয়া হয়। নতুন আইনটি মূলত ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশের সংশোধিত ও পরিমার্জিত সংস্করণ।
এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সাইবার নিরাপত্তা আইনের বিতর্কিত কয়েকটি ধারা বাতিল করে অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। তবে সেই অধ্যাদেশে অনলাইন জুয়া সংক্রান্ত যে বিধান ছিল, তা নতুন আইনে আর রাখা হয়নি। কারণ একই দিনে সংসদে জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬ পাস হওয়ায় জুয়া-সংক্রান্ত অপরাধ আলাদা আইনের আওতায় আনা হয়েছে।
সাইবার বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন আইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি ডিপফেইক ছবি, ভিডিও বা অডিওকে স্পষ্টভাবে আইনের আওতায় আনা। এখন থেকে এ ধরনের ভুয়া কনটেন্ট তৈরি বা ছড়িয়ে কারও ক্ষতি করলে তা দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। একই সঙ্গে ভুয়া তথ্য, বিভ্রান্তিকর ও মানহানিকর ডিজিটাল কনটেন্টের সংজ্ঞাও হালনাগাদ করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ও সাইবার অপরাধ বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা বলেন, এআইনির্ভর ভুয়া তথ্য, ডিপফেইক এবং ডিজিটাল প্রতারণা মোকাবিলায় নতুন আইনটি আগের তুলনায় অনেক বেশি যুগোপযোগী হয়েছে। তবে আইনের সফলতা নির্ভর করবে দ্রুত ও দক্ষ তদন্ত, আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা এবং নিরপেক্ষ প্রয়োগের ওপর।
অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য প্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. বিএম মইনুল হোসেনের মতে, আগের নিবর্তনমূলক অনেক ধারা বাদ দেওয়া হলেও নাগরিকদের সাইবার অধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সরকারি সংস্থাগুলোর জবাবদিহিতার বিষয়টি আইনে স্পষ্ট করা হয়নি।
নতুন আইনে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে আপত্তিকর কনটেন্ট দ্রুত অপসারণের নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এবং সরকার অনুমোদিত সংস্থাগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী আপত্তিকর কনটেন্ট ব্লক করতে পারবে।
আইন অনুযায়ী, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অবকাঠামোয় বেআইনিভাবে প্রবেশ বা হ্যাকিং করে ক্ষতি করলে সর্বনিম্ন পাঁচ বছর থেকে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড এবং কোনো ক্ষেত্রে এক কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড হতে পারে। এছাড়া সাইবার প্রতারণার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড, ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া সাইবার সন্ত্রাস, অবৈধ ই-ট্রানজেকশন, অনলাইনে যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইল, রিভেঞ্জ পর্ন, ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও প্রকাশের হুমকি, ধর্মীয় ও জাতিগত বিদ্বেষমূলক তথ্য প্রচারসহ বিভিন্ন অপরাধের জন্যও কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
আইনে আরও বলা হয়েছে, এই আইনের অধীনে দায়ের হওয়া মামলার অভিযোগ গঠনের পর ট্রাইব্যুনালকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে বিচার শেষ করতে হবে। প্রয়োজন হলে এ সময়সীমা সর্বোচ্চ ৯০ কার্যদিবস পর্যন্ত বাড়ানো যাবে।
বাংলাদেশে সাইবার আইনের ইতিহাসে ২০০৬ সালের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের বহুল সমালোচিত ৫৭ ধারা দীর্ঘদিন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। পরে তা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং সাইবার নিরাপত্তা আইনে রূপ নিলেও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার অভিযোগ ছিল। সেই প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকার আগের আইন বাতিল করে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ জারি করে, যা সংশোধনের মাধ্যমে এখন সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬ হিসেবে কার্যকর হয়েছে।




















